সর্বশেষ সমাচার

সুষ্ঠ নির্বাচন হলে ক্ষমতায় যাবে আওয়ামীলীগ !

তাহসিনা তাবাসসুম 26.Apr.2025; 08:44:10

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কিনা, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী দল। এই দলটি ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্বাধীনতা অর্জন করে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে পুরাতন এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। তবে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির পর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দলের অংশগ্রহণ এবং সুষ্ঠ নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করবো যে, সুষ্ঠ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটুকু এবং সুষ্ঠ নির্বাচন আদৌ সম্ভব কিনা।

 

আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও জনপ্রিয়তা

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে এই দলের নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এই ঐতিহাসিক অবদানের কারণে আওয়ামী লীগ দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি গত কয়েক দশকে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন, এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

এই সকল অর্জনের কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি দেশের একটি বৃহৎ অংশের জনগণের সমর্থন এখনো অটুট রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য। এমনকি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার পরেও জনগণের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের সমর্থন বজায় রেখেছে।

 

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আওয়ামী লীগের উপর হামলা

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে এবং দলটির নেতাকর্মীদের উপর ব্যাপক হামলা ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, ভাংচুর করা, এবং আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীর বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

এই হামলাগুলোর ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে, এই নিপীড়নের ফলে জনগণের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে মনে করেন যে, বিরোধী দলগুলোর এই সহিংস কার্যকলাপ আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জনগণের এই সহানুভূতি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে কাজ করতে পারে।

 

সুষ্ঠ নির্বাচনের সম্ভাবনা

সুষ্ঠ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। অতীতের নির্বাচনগুলোতে প্রায়ই ভোট কারচুপি, সহিংসতা, এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাসের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুষ্ঠ নির্বাচনের সম্ভাবনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

আওয়ামী লীগের বিরোধী দলগুলো, যারা আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে, তারা প্রকাশ্যে সুষ্ঠ নির্বাচনের কথা বললেও তাদের কার্যকলাপ এই প্রতিশ্রুতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই দলগুলোর মধ্যে কট্টরপন্থী মনোভাব এবং প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি অনীহা লক্ষ্য করা যায়। তারা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলেও, তাদের প্রচারণা এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সুষ্ঠ নির্বাচনের নিশ্চয়তা প্রশ্নবিদ্ধ।

একটি সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, এবং সকল রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই শর্তগুলো পূরণ করা কঠিন। বিরোধী দলগুলোর আওয়ামী লীগের প্রতি বৈরী মনোভাব এবং তাদের সহিংস কার্যকলাপ নির্বাচনী পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে।

 

আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা

যদি আগামী নির্বাচন সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত উচ্চ। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে:

  • জনপ্রিয়তা ও সহানুভূতি: আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক অবদান এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের উন্নয়নের কারণে দলটির প্রতি জনগণের সমর্থন এখনো শক্তিশালী। সাম্প্রতিক হামলা ও নিপীড়নের ফলে জনগণের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচনে তাদের পক্ষে কাজ করতে পারে।
  • সাংগঠনিক শক্তি: আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। তৃণমূল পর্যায়ে তাদের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে, যা নির্বাচনী প্রচারণায় তাদেরকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রাখে।
  • উন্নয়নের রেকর্ড: শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এই অর্জনগুলো নির্বাচনে তাদের পক্ষে একটি শক্তিশালী প্রচারণার বিষয় হতে পারে।
  • বিরোধীদের দুর্বলতা: বর্তমান বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কট্টরপন্থী মনোভাব এবং প্রগতিশীল রাজনীতির অভাব তাদের জনপ্রিয়তাকে সীমিত করে দিয়েছে। তাদের সহিংস কার্যকলাপ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে, যা আওয়ামী লীগের পক্ষে যেতে পারে।

তবে, এই সম্ভাবনা পূরণের জন্য একটি সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি বিরোধী দলগুলো আওয়ামী লীগের প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করে বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারচুপি করে, তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

 

সুষ্ঠ নির্বাচনের পথে চ্যালেঞ্জ

সুষ্ঠ নির্বাচনের পথে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

  • বিরোধী দলগুলোর মনোভাব: বিরোধী দলগুলোর কট্টরপন্থী মনোভাব এবং আওয়ামী লীগের প্রতি বৈরিতা সুষ্ঠ নির্বাচনের পথে প্রধান বাধা। তারা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করছে।
  •  নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা: একটি সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের উপর রাজনৈতিক চাপ থাকতে পারে।
  • সহিংসতা ও অস্থিরতা: সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। নির্বাচনের সময় এই সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
  • জনগণের আস্থা: অতীতের নির্বাচনগুলোতে কারচুপির অভিযোগ জনগণের মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করেছে। এই অবিশ্বাস দূর করা সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
  •  

সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য প্রস্তাবনা

সুষ্ঠ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:

  • নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন: একটি নিরপেক্ষ এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কমিশনের উপর কোনো রাজনৈতিক চাপ থাকা উচিত নয়।
  • সকল দলের জন্য সমান সুযোগ: সকল রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী প্রচারণা ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সমান সুযোগ দিতে হবে।
  • সহিংসতা প্রতিরোধ: নির্বাচনের সময় সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
  • আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ: নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের পর্যবেক্ষণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে।
  • জনগণের অংশগ্রহণ: জনগণকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করতে হবে। ভোটার শিক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত।

 

উপসংহার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। দলটির ঐতিহাসিক অবদান, জনপ্রিয়তা, এবং উন্নয়নের রেকর্ড এটিকে আগামী নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যদি নির্বাচন সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত উচ্চ। তবে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিরোধী দলগুলোর মনোভাব সুষ্ঠ নির্বাচনের পথে বড় বাধা। সুষ্ঠ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, সকল দলের জন্য সমান সুযোগ, এবং সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র একটি সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণের প্রকৃত ইচ্ছা প্রতিফলিত হবে এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।

 

আরো প্রবন্ধ