সর্বশেষ সমাচার

মানব ভুমি

.$posted_by. মোঃ শহর আলী 05.Jul.2019; 02:48:31

তিন

 

ভর দুপুরে গ্রামের মৃর্ধাদের বাঁশ বাগানে বেতের ঝোপের পাশে বসিয়া আড্ডায় মগ্ন হইয়া আছে মিশু আর আলী। বাগানে শুধু বাঁশ আর বেত নয়, আম, কাঁঠাল, জাম সহ নানা প্রকার কাঠ জাতীয় গাছ ও ঝোপঝাড়ে এতটাই ঠাসাঠাসি যে দিনের বেলায়ও অন্ধকার মনে হয়। সেইখানে মানুষে সচরাচর পা পড়ে না বলিয়াই মিশু জায়গাটা বাছিয়া লইয়াছে। সে বলিল, দেখ আলী, আমাদের গ্রামে রমনা পার্ক নাই যে সেইখানে গিয়া কিছুটা সময় নিরিবিলি কাটাইয়া আসিব। এই বাগানটাই আমাদের রমনা পার্ক, গ্রামের জাতীয পার্ক বলিয়াই আমি মনে করি। বরং এই কথা বলিতে পারি যে, রমনা পার্কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ইহা অপেক্ষা বেশি নহে। আলী সবই মানিয়া নিল।

আলী অন্য কথা আরম্ভ করিল। সে বলিল, পাঠ্য বইয়ে যেসব কবি সাহিত্যিকদের লেখা আছে তাহা ভাল করিয়াই পড়িয়াছি। কিন্তু তাহাদের মুল বইগুলি পড়িবার সৌভাগ্য আমাদের হইল না। যদিও অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলেদের অনেকেই তাহা পড়িয়াছে। এখন বই পড়িবার যে তৃষ্ণা অনুভব করিতেছি বড় হইলে উহা মিলাইয়া যাওয়ার ভয় রহিয়াছে। এ্র্ই বয়সে বই পড়িবার সুযোগ না পাইলে, বড় হইয়াতো পড়ার সময়ও পাওয়া যাইবে না, আনন্দও পাওয়া যাইবে না। 

মিশু যে সে কথা ভাবে নাই তাহা নহে। কিছুদিন ধরিয়া সে ইহা লইয়াই চিন্তা ভাবনা করিয়া চলিয়াছে। শহরে গিয়া একটা দুইটা বই কিনিয়া আনিবার কথাও সে ভাবিয়াছে। অভাবের সংসারে পাঠ্য বই কিনিয়া পড়িতেই তাহার বহু কষ্ট হইয়াছে। ইহার বাহিরে অন্য বই কিনিবে কেমন করিয়া। তবে ইহার একটি ভাল সমাধান সে একদিন করিতে পারিবে বলিয়াও বিশ্বাস করে। আজ আলীর কথায় সে আরো বেশি চিন্তা করিতে লাগিল এবং তাহার চিন্তা করিয়া বাহির করিয়া রাখা একটা বিষয়ে সে প্রস্তাব করিল। সে বলিল, আমরা একটা লাইব্রেরী তৈরি করিব।

আলী বলিল, লাইব্রেরী কেন? বুঝলাম নাতো!

আরে এই লাইব্রেরী বই বিক্রির লাইব্রেরী নয়, এটা হইতেছে পাঠাগার, বলল মিশু।

আলী বুঝিল এবং উৎসাহে তাহার চোখ জ্বলজ্বল করিয়া পুনরায় নিবিয়া যাইতেছিল। মিশু কহিল, টাকার কথা লইয়া ভাবিবার প্রয়োজন নাই। আমাদের স্কুলের পাশে মসজিদের ইমাম সাহেবের থাকিবার যে পরিত্যক্ত ঘরটি পড়িয়া রহিয়াছে ওইখানেই আমরা লাইব্রেরী তৈরি করিব।

আলী কহিল, বই পাইব কোথায়, চেয়ার টেবিল পাইব কোথায়।

মিশু তাহাও চিন্তা করিয়া রাখিয়াছে। সে বলিল, গ্রামের ছেলেদের লইয়া এই বিষয়ে একটা জরুরী সভা করিতে হইবে। আসবাবপত্র গ্রাম হইতে সংগ্রহ করা যাইবে। যাহাদের বাড়িতে অতিরিক্ত বা পুরনো চেয়ার টেবিল রহিয়াছে তাহা লইয়া আসিব।

আর বই? আলীর প্রশ্ন।

বই জোগাড় করা আরো সহজ। বন্ধুরা মিলিয়া সভা করিয়া সবাই এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করিতে হইবে যে, আমাদের যাহার ঘরে যে বই রহিয়াছে তাহাই সর্বপ্রথম লাইব্রেরীতে জমা করিব। ইহার পরে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়া পুরনো ও অতিরিক্ত বই আছে কিনা জিজ্ঞাসা করিয়া করিয়া বই সংগ্রহ করিতে হইবে।


আরও পড়ুন : আজকে না হয় নাই হল
আরও পড়ুন : জল ছাড়া বৃষ্টি

আলী হাসিয়া কহিল, তাহা হইলে কি আমরা বই ভিক্ষায় নামিব?

ইহাকে বই ভিক্ষাও বলা যাইতে পারে। তবে আমাদের উৎসাহ ও কর্মকান্ড ভাল হইলে বিভিন্ন মহল হইতে সাহায্য আসিবার সম্ভাবনাও রহিয়াছে। আমি ইহা নানা ভাবে চিন্তা ভাবনা করিয়া  রাখিয়াছি।

যেই কথা সেই কাজ। কলেজ পড়ুয়া ও স্কুল পড়ুয়া ছেলেদের লইয়া একটা সভা হইয়া গেল। প্রায় পঁয়ত্রিশ জন ছেলে সভায় উপস্থিত থাকিয়া মিশুর প্রস্তাবে তাহাদের পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করিল। দুই চারজন যে ইহার বিরুদ্ধে কথা বলিল না তাহা নহে। তাহারা কেউ কেউ সভা ছাড়িয়া উঠিয়া গিয়া আলাপ করিতে লাগিল যে, ভাত পায় না আবার লাইব্রেরী ঠাওরায়। একেই বলে গরীবের ঘোড়ার রোগ। আমার বাপু এক কথা গ্রামে ভিক্ষা করিয়া লাইব্রেরী দেওয়ার কাজে আমি নাই। আমার বই পড়িবার ইচ্ছা হইলে নিজেই কিনিয়া পড়িতে পারি, সময় কোথায়। ইত্যাদি ইত্যাদি।

মিশু দমিয়া গেল না। কলেজ অপেক্ষা স্কুলের ছেলেদের উৎসাহ বেশি দেখা গেল। তাহারা ইমাম সাহেবের পরিত্যক্ত ঘরের সামনে ছোট উঠান টুকুর আগাছা পরিষ্কার করিয়া দুই পাশে ফুলের গাছ লাগাইল। বাগান হইতে বাঁশ কাটিয়া আনিয়া উঠোনের পাশে কয়েকখানা স্থায়ী বেঞ্চ তৈরি করিয়া ফেলিল। 

গ্রামের অধিকাংশ ছেলে মেয়ে তাহাদের ঘরে থাকা বইগুলো লাইব্রেরীতে জমা করিয়া দিল। তাহারা টিফিনের পয়সা বাঁচাইয়া লাইব্রেরীর জন্য রেজিস্টার খাতা, কলম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনিয়া ফেলিল। প্রতিদিন বিকাল চারটা হইতে আরম্ভ করিয়া সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত লাইব্রেরী খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হইল। ছেলেমেয়েরা দলে দলে আসিয়া বই পড়িতে লাগিল। আবার রেজিস্টারে নাম লিখাইয়া সর্বোচ্চ তিনদিনের জন্য একটি বই বাড়িতে লইয়া গিয়া পড়িবার সুযোগও পাইতে লাগিল।

 

(চলবে)

 

এ বিষয়ে আরো খবর